কুরবানির পর দুর্গন্ধ: নাস্তিকদের টকশো খোরাক! - গোলাম হাসনাইন আসাদুজ্জামান।


"কুরবিয়ত" তথা আল্লাহর নৈকট্য লাভের লক্ষ্যে পশু কুরবানি হয়।এটি একটি মেডিটেশন বা প্রশিক্ষণ। কুরবানির মধ্যে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার পরম উৎকর্ষতা। শর্ত হলো, লৌকিকতা মুক্ত ও সম্পূর্ণ শরিয়ত অাঙ্গিকে হওয়া অাবশ্যক।

সব ঠিকঠাক হলো। অতঃপর কুরবানি পরবর্তী সময়ে অনেক অনেক এলাকা জুড়ে দুর্গন্ধের ছড়াছড়ি। দুর্গন্ধের উৎস কুরববানির পরিত্যক্ত অংশ।কুরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করা হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টিসাধনের জন্য। কিন্তু যত্রতত্র ঐ কুরবানি কৃত পশুর বর্জ্য ফেলে পরিবেশ দূষণ করেছি কার জন্য?  আল্লাহ বলেন-


لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَائُهَا وَلـكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوى مِنْكُمْ-


“ও সব পশুর রক্ত, মাংস আল্লাহর কাছে কিছুতেই পৌঁছে না। বরং তোমাদের পক্ষ থেকে তোমাদের তাকওয়া তাঁর কাছে পৌঁছে”। { সূরা আল হজ্জ-৩৭}  

অথচ আমরা অনেকেই কুরবানি পশুর বর্জ্য যত্রতত্র ফেলে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে আল্লাহর কাছে তাকওয়ার বদলে অশিষ্টতা ও উদাসিনতা প্রেরণ করি! যেমন: 

১/কোন মুসলিম দুর্গন্ধ পেয়ে বলে উঠলো "ইয়া আল্লাহ! এমন কুরবানিতো তুমি চাওনি, যার ফলে মানুষ দুর্গন্ধের শিকার হবে"।

 ২/কোন অমুসলিম গন্ধ পেয়ে মুসলিম,ইসলাম ও আল্লাহকে নিয়ে গালিগালাজ করবে। 

৩/কোন নাস্তিক সরাসরি ইসলামের দিকে অাঙ্গুল তুলে বলার সুযোগ পাবে যে, ইসলাম পরিবেশ দূষিত করছে। 

৪/এই দুর্গন্ধের কারণে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার ফুসফুসীয় সমস্যা, হাঁপানি, হৃদরোগ, এমনকি ক্যান্সারের মতো মরণ ব্যাধি পর্যন্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এতগুলো সমস্যা যদি কারো কুরবানি পশুর বর্জ্যের কারণে হয়, তাহলে সে কুরবানি অাল্লাহর দরবারে বিন্দুমাত্রও কি গ্রহণযোগ্যতা রাখে? আল্লাহ বলছেন-


اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ “আল্লাহ শুধু মুত্তাকীদের   আমল কবুল করেন”। { সূরা  আল মায়িদ্হ -২৭}   

এখন অালোচ্য কুরবানি দাতা তো চরমভাবে ইসলামকে অভিযুক্ত করেছে, তাকে কিভাবে মুত্তাকী বলা যাবে? প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, «الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ»


‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।’ [মুসলিম : ২২৩]  প্রিয় রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক করেছেন - «اتَّقُوا اللَّاعِنَيْنِ» ، قَالُوا: وَمَا اللَّاعِنَانِ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: «الَّذِي يَتَخَلَّى فِي طَرِيقِ النَّاسِ أَوْ ظِلِّهِمْ»


‘তোমরা লা‘নতকারী (অভিশাপের কারণ) দু’টি কাজ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, লা‘নতকারী (অভিশাপের কারণ) দু’টি কাজ কী? তিনি বললেন, যে মানুষের চলাচলের রাস্তায় কিংবা তাদের ছায়ায় পেশাব-পায়খানা করে।’ [আবূ দাঊদ : ২৫; মুসনাদ আহমদ : ৮৮৫৩] 

লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে, পেশাব-পায়খানার দুর্গন্ধ মানুষকে কষ্ট দেয় বিধায় এহেন গর্হিত কাজ অভিশাপের কারণ। ঠিক একই কারণ পাওয়া যাচ্ছে, কুরবানি পশুর বর্জ্যের দুর্গন্ধে! তবে এটি আরো অধিক গর্হিত কাজ হিসেবে প্রতিয়মান হচ্ছে, যেহেতু কুরবানি একটি ইবাদত। অথচ এই ইবাদত কে ব্যাহত করা হচ্ছে জঘন্য কার্যকলাপের মাধ্যমে! হাদীস শরিফে এসেছে- 

«الْإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ – أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ – شُعْبَةً، فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الْأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ، وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيمَانِ»


‘ঈমানের সত্তরের কিছু বেশি কিংবা ষাটের কিছু বেশি শাখা আছে; তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলা আর নিম্নতম হলো (চলাচলের) পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জাও ঈমানের একটি শাখা। [মুসলিম : ৩৫] যে ইসলাম পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা ঈমানের অংশ হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছে, পরিবেশ দূষিত করা অভিশাপের কারণ ঘোষণা করেছে, সে অতুলনীয় ইসলামের দিকেই অভিযোগের অাঙ্গুল তুলছে অবিশ্বাসীরা! প্রতিনিয়ত ইসলামের বিধান লঙ্ঘনকারী কতিপয় নামধারী মুসলিমদের কারণে এ সুযোগ তারা হাসিল করে নিচ্ছে। পরিবেশের সার্বিক বিষয়ে ইসলাম গভীর পর্যবেক্ষণ করে বিধান দিয়েছে। যেমন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহি ইরশাদ করছেন- «إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ يُحِبُّ الطَّيِّبَ، نَظِيفٌ يُحِبُّ النَّظَافَةَ، كَرِيمٌ يُحِبُّ الكَرَمَ، جَوَادٌ يُحِبُّ الجُودَ، فَنَظِّفُوا – أُرَاهُ قَالَ – أَفْنِيَتَكُمْ وَلَا تَشَبَّهُوا بِاليَهُودِ»


নিশ্চয় আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্রকে পছন্দ করেন; আল্লাহ পরিচ্ছন্ন, তিনি পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন; আল্লাহ মহৎ, তিনি মহত্ত্ব পছন্দ করেন; আল্লাহ বদান্য, তিনি বদান্যতা পছন্দ করেন। অতএব তোমরা তোমাদের (ঘরের) উঠোনগুলো পরিচ্ছন্ন রাখবে। [তিরমিযী : ২৭৯৯][2] 

পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘পানির ঘাটে, রাস্তার মাঝে, গাছের ছায়ায় মলত্যাগ থেকে বিরত থাকবে।’ (মিশকাত)  নবীজি আরো ইরশাদ করেন-  لَا يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي الْمَاءِ الدَّائِمِ ثُمَّ يَغْتَسِلُ مِنْهُ»


‘তোমাদের কেউ যেন বদ্ধ পানিতে পেশাব না করে অতঃপর তা দিয়ে গোসল করে।’ [বুখারী : ২৩৯; মুসলিম : ২৮২]  আরো লক্ষ্য করুন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করছেন- «كُلُّ سُلاَمَى مِنَ النَّاسِ عَلَيْهِ صَدَقَةٌ، كُلَّ يَوْمٍ تَطْلُعُ فِيهِ الشَّمْسُ، يَعْدِلُ بَيْنَ الِاثْنَيْنِ صَدَقَةٌ، وَيُعِينُ الرَّجُلَ عَلَى دَابَّتِهِ فَيَحْمِلُ عَلَيْهَا، أَوْ يَرْفَعُ عَلَيْهَا مَتَاعَهُ صَدَقَةٌ، وَالكَلِمَةُ الطَّيِّبَةُ صَدَقَةٌ، وَكُلُّ خُطْوَةٍ يَخْطُوهَا إِلَى الصَّلاَةِ صَدَقَةٌ، وَيُمِيطُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ»


‘সূর্যোদয় হয় এমন প্রতিটি দিন মানব দেহের প্রতিটি জোড়া তথা গ্রন্থির ওপর সাদকা ওয়াজিব হয়। তুমি দু’টি মানুষের মধ্যে যে ন্যায়বিচার করো, তা সাদকা। তুমি মানুষকে তার ভারবাহী পশুর ওপর চড়িয়ে দিয়ে কিংবা তার ওপর মালপত্র তুলে দিয়ে যে সাহায্য করো, তাও সাদকা। (এমনিভাবে) কাউকে ভালো কথা বলাও সদকা। নামাযের দিকে যাওয়ার সময় তোমার প্রতিটি পদক্ষেপ সাদকা। রাস্তা থেকে তুমি যে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেল, তাও সাদকা। [বুখারী : ২৯৮৯; মুসলিম : ১০০৯]  

এভাবে শুধু পরিবেশের ব্যাপারে ইসলামের বিধানগুলো আলোচনা করতে গেলে লেখার আয়তন বিশাল আকার ধারন করবে। উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে স্পষ্টতর যে, আঙ্গিনা, জলাশয়, মাঠঘাট তথা পরিবেশের সার্বিক সুরক্ষার ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়।  

এখন কথা হচ্ছে স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থাপনার ধর্ম ইসলামের স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও যদি কোন মুসলিম কুরবানি পশুর বর্জ্যের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ ঘটায়; তখন তথাকথিত সুশীল ও বুদ্ধিজীবীরা ইসলামকে টার্গেট বানায়। তারা টকশোতে কুরবানির কুফল তুলে ধরে মুক্তচিন্তার প্রয়াস ঘটায়। যদিও পরিবেশ দূষণের আপত্তি না উঠলেও কুরবানির বিরুধীতা চলতো; তথাপি তাদের টকশোর খোরাক যোগানদাতা হিসেবে কতেক মুসলিমতো অবশ্যই দায়ী! তাই পরিবেশ দূষণ রোধে ইসলামের স্পষ্ট বিধানগুলো মসজিদ-মাদ্রাসা সহ সামাজিক ক্ষেত্র সমূহে দৃঢ়তার সাথে প্রচার করা জরুরি।এক্ষেত্রে ধর্মীয় সামাজিক সংগঠনগুলো বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখলে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।

মন্তব্যসমূহ

কাগজ ৭১ বলেছেন…
সম্মানিত ভিজিটরদের আন্তরিক মোবারাকবাদ।

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

হাইকোর্ট মাজার: হযরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতী(রাহঃ) এঁর জীবনী

গাউছুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (ক.) এঁর জীবনী

হযরত শাহ্ মখদুম রূপস (রাহঃ) এঁর জীবনী